ইলিশের ভরা মৌসুমেও শরীয়তপুরের পদ্মা নদীতে কাক্সিক্ষত ইলিশের দেখা মিলছে না। জেলেদের জালে আগের তুলনায় ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় কমে গেছে ইলিশের বিচরণ ও আহরণ। ইলিশ শিকারের নেশায় পদ্মায় দিন-রাত চষে বেড়াচ্ছেন জেলেরা। এ সময়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ার কথা থাকলেও কাক্সিক্ষত ইলিশের দেখা না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলার প্রায় ৫ হাজার জেলে। এতে বিপাকে পড়েছেন জেলে, নৌযান চালক এবং নদীপাড়ের মানুষ।
বৃহস্পতিবার সরে জমিনে গিয়ে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মার মাঝপথে গত দুই বছরে বেশ কয়েকটি বড় ডুবোচর তৈরি হয়েছে। এতে নতুন চ্যানেল তৈরি হওয়ায় নদীর মূল প্রবাহ অনেকটা সরে গেছে। নদীর তলদেশে পলি জমে থাকায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণেও প্রভাব পড়েছে। আগে যেই অংশে জাল ফেললেই ইলিশ মিলত, এখন নদীর স্রোত ও গভীরতা বদলে যাওয়ায় মাছের চলাচলের পথও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় ইলিশের আহরণ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা ও মেঘনা নদীবেষ্টিত শরীয়তপুর জেলায় মোট ৭১ কিলোমিটার নদীপথ রয়েছে। এর মধ্যে নড়িয়া উপজেলার ৫ কিলোমিটার এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলার ১৫ কিলোমিটারসহ মোট ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। নদীর গভীরতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় না থাকলে ইলিশসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নড়িয়া সুরেশ^র ঘাট, জাজিরার পালেরচর বাজারসহ কয়েকটি ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ না পাওয়ায় মৎস্য ঘাটে চলছে হাহাকার। ক্রেতা-বিক্রেতাদের নেই সমাগম। জমে উঠছে না মৎস্যঘাট। বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আসলেও ইলিশ না ধরা পড়ায় খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে তাদের।
মাওয়া ঘাটের জেলে রফিক মাঝি ও আয়নাল সরদার বলেন, তিন দশক ধরে পদ্মায় মাছ ধরলেও এখন আগের মতো ইলিশ মিলছে না। আগে কয়েক ঘণ্টা জাল ফেললেই ভালো পরিমাণ বড় আকারের ইলিশ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন নদীতে থেকেও সেই তুলনায় অনেক কম মাছ মেলে। এতে আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে বিকল্প পেশার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, নদীর মাঝখানে চর জেগে ওঠা এবং স্রোতের গতিপথ বদলে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণও কমে গেছে।
কাঁচিকাটা ঘাটের আড়ৎ মালিক দেওয়ান ফকির বলেন, জেলেরা প্রতিদিন নদীতে গিয়ে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় অনেক লোকসান গুনতে হচ্ছে। মাছ না পাওয়ায় ঘাটে পাইকার আসে না। আসলেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে, অনেককে। তাই আড়ৎ আগের মতো জমে উঠেনি। এতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য।
এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, পদ্মা নদীর শরীয়তপুর অংশে একসময় ইলিশের ব্যাপক বিচরণ থাকলেও এখন নদীর গভীরতা ও প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। পানির স্রোত বেশি থাকায় ইলিশ মাছ উপরে আসতে পারছে না। শরীয়তপুরে পদ্মার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলেও নাব্যতা সংকটের কারণে ইলিশের চলাচল আগের মতো স্বাভাবিক নেই। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চর অপসারণ জরুরি।